• সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২০, ০২:৪১ অপরাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English
শিরোনাম
বীরগঞ্জে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের উপকরণ আগুনে পুড়ে ধ্বংস মুজিববর্ষ ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে পাবনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ  সাতক্ষীরায় করোনা ও করোনা উপসর্গ নিয়ে লম্বা হচ্ছে মৃত্যুর লাইন, মৃত্যু ৮৩ জনের শ্যামনগরে গলায় ফাঁস দিয়ে যুবকের আত্নহত্যা মণিরামপুরে সাপের কামড়ে শিশুর মৃত্যু সাতক্ষীরা তালায় সড়ক দুর্ঘটনায়  আবু নাসের হাসপাতালের হিসাবরক্ষক সহ ২ জন নিহত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সরবরাহে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি ইসলামপুরে মাওলার ১৪৩০তম অভিষেক দিবস উদযাপন ৩ দিন পার হলেও প্রদীপ-লিয়াকতকে এখনো রিমান্ডে নেয়া যায়নি হাসপাতালে কোনও অনিয়ম অনুসন্ধান বন্ধ হয়নি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

চিকিৎসা সেবায় প্রতারণা ও নৈরাজ্য: ১

লক্ষ্মীপুরে ডিগ্রীবাজি করেই চলছে ডাক্তারদের জমজমাট ব্যবসা

মো: নজরুল ইসলাম দিপু, সোহেল রানা
প্রকাশ হয়েছে : বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২০ | ১২:৫৬ pm
                             
                                 

‘ডাক্তার’ একটি সম্মানজনক পেশা। মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য এই পেশাই কাজ করে থাকেন। স্বাস্থ্য সেবা প্রদানসহ জাতির ক্রান্তিকালে তারাই ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে মহামারি করোনা ক্রান্তিকালেও এই ডাক্তাররা জীবন বাজি রেখে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। প্রাণও হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন। মানুষকে সেবাদানের কারণে এই পেশাধারীরা মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানের উঁচু স্থানে থাকে। কিন্তু সেই সম্মানের কিছু মানুষই যদি রোগীদের সাথে প্রতারণা করে তাহলে তাদের প্রতি মানুষের আস্থা কতটুকু থাকে এমনই প্রশ্ন তোলেন সচেতন মহল।

সারাদেশের ন্যায় লক্ষ্মীপুরে চলছে ডাক্তারদের জমজমাট ব্যবসা। সেবার আড়ালে এক শ্রেণীর ডাক্তাররা প্রতারণামূলক ও অনঅনুমোদিত ডিগ্রী ব্যবহার করে মানুষের ইমোশনের সাথে ব্লাকমেইল করে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। একদিকে অতিরিক্ত ভিজিট ফি, অন্যদিকে অতিরিক্ত টেস্ট এর কমিশন বাণিজ্য। স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতাল, ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, ফার্মেসী ও বিভিন্ন প্রাইভেট চেম্বারে দেখছেন রোগী। নামের নিচে স্বীকৃত অনস্বীকৃত বিভিন্ন ডিগ্রী। রোগীরাও তাদের সাটানো সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপন, ভিজিটিং কার্ড এর লোভনীয় ডিগ্রী দেখে চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন।

কারো আবার পোষ্ট্র গ্রাজুয়েশন বা অনুমোদিত ডিপ্লোমা ডিগ্রী না থাকলেও লিখছেন অভিজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। আবার সদ্য পাশ করা এমবিবিএস ডাক্তাররাও বিভিন্ন বিভাগের রোগের অভিজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ লিখে প্রতারণামূলকভাবে রোগী দেখছেন ও ব্যবসা করে যাচ্ছেন।

তবে এসবের মধ্যেও এই জেলায় অনেক উচ্চতর ডিগ্রীধারী ডাক্তার আছেন। যারা সরকারিভাবে ও প্রাইভেট চেম্বারের মাধ্যমে রোগীদেরকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। যথাযথ বিষয়েই রোগীদেরকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।

লক্ষ্মীপুরে এমন ডাক্তারদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এসব ডাক্তারগণ বাংলাদেশ মেডিক্যাল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের আইন ও নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে করছেন চেম্বার, দেখছেন রোগী। ব্যাঙ্গের ছাতার মত অনঅনুমোদিত বিভিন্ন ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে তাদের কদর বেশি। সারাদিন এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে ছুটে বেড়াচ্ছে তারা। কোন প্রকার পোষ্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী না থাকলেও দেখছেন সর্বরোগের রোগী। সকল রোগের চিকিৎসাও দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ আছেন গাইনি রোগীর চিকিৎসক ও সিজারিয়ান। হাসপাতালে সিজার করে কামাচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। অথচ এইসব বিষয়ে তাদের কোন প্রকার উচ্চতর ডিগ্রীও নেই। গ্রাম ডাক্তাররা কমিশনের মাধ্যমে এসব ডাক্তারদের কাছে রোগী পাঠান। আর ডাক্তারও অতিরিক্ত টেষ্ট দিয়ে কমিশন বাণিজ্য করে থাকেন।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, মাত্র ৬ মাসের পিজিটি করে দেখছেন মেডিসিন, হৃদরোগ, বক্ষব্যাধি, গাইনী রোগী। কেউবা করছেন সিজার। আবার অনেকে স্বল্পকালীন ট্রেনিং (সিএমউ) নিয়ে করছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ টেষ্ট আল্ট্রাসনোগ্রাফি। অভিজ্ঞতা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ না থাকায় এসব ডাক্তারদের দেয়া রিপোর্টে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়েছে তার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। অনেকে নামের সাথে লাগাচ্ছেন এফসিপিএস পার্ট-১, শেষ পার্ট, কোর্স ইত্যাদি। যার নামের সাথে বেশি ডিগ্রী সে অভিজ্ঞ ডাক্তার মনে করে রোগীরাও ছুটছেন তাদের কাছে। এছাড়াও এসব অনভিজ্ঞ ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসায় কারো কারো ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, কেউ সারা জীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন কেউবা হারিয়েছেন প্রাণ। সেসব তথ্য নিয়ে পরবর্তি পর্বে আসছে বিস্তারিত।

বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল এর রেজিষ্ট্রার স্বাক্ষরিত এক পত্রে বাংলাদেশের ডাক্তারদের বিভিন্ন অনঅনুমোদিত ডিগ্রী ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। এসব ডিগ্রি ও কোর্সকে প্রতারণামূলক উল্লেখ করে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে।’ ওই নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, এসব ডিগ্রি কোনও স্বীকৃত চিকিৎসা শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা বিএমডিসি স্বীকৃত নয়। এসব ডিগ্রীর মধ্যে রয়েছে, পিজিটি, বিএইচএস, এফআরসিপি, এফআরএইচএস, এফআইসিএ, এফআইসিএস, এফএএমএস, এফআইএজিপি’র মতো বিভিন্ন ডিগ্রি ও ট্রেনিং কোর্স।’

বিএমডিসির রেজিষ্ট্রার জানান, এ ধরনের ভুয়া ডিগ্রি রোধে ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল বিএমডিসি থেকে একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়ে, কোনও কোনও নিবন্ধিত চিকিৎসক/দন্তচিকিৎসক তাদের সাইনবোর্ড, প্রেসক্রিপশন প্যাড, ভিজিটিং কার্ড ইত্যাদিতে পিজিটি, বিএইচএস, এফসিপিএস (পার্ট-১), (পার্ট-২), এমডি (ইনকোর্স) (পার্ট-১)-(পার্ট-২), (থিসিস পর্ব), (লাস্ট পার্ট), কোর্স কমপ্লিটেড (সিসি), এম (ইনকোর্স) (পার্ট-১)-(পার্ট-২), (থিসিস পর্ব) (লাস্ট পার্ট), কোর্স কমপ্লিটেড (সিসি) ইত্যাদি এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া ফেলোশিপ এবং ট্রেনিংসমূহ যেমন এফআরসিপি, এফআরএইচএস, এফআইসিএ, এফআইসিএস, এফএএমএস, এফআইএজিপি ইত্যাদি উল্লেখ করছেন, যা কোনও স্বীকৃত চিকিৎসা শিক্ষাগত যোগ্যতা নয় এবং বিএমডিসি থেকে স্বীকৃত নয়।’

‘ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি না থাকার পরও কেউ কেউ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, সার্জারি বিশেষজ্ঞ, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ, গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাদের পরিচিতি দিয়ে তা প্রেসক্রিপশন প্যাড, সাইনবোর্ড, ভিজিটিং কার্ড ইত্যাদিতে ব্যবহার করেন, যা জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণামূলক কাজ হিসেবে গণ্য। একইসঙ্গে সব নিবন্ধিত চিকিৎসক/দন্ত চিকিৎসককে বিএমডিসির স্বীকৃতিবহির্ভূত কোনও ডিগ্রি, পদবি, ফেলোশিপ, ট্রেনিং ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ স্বীকৃত পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান ডিগ্রি না থাকার পরও নামের পর বিশেষজ্ঞ পদবি ব্যবহার না করার নির্দেশও দেওয়া হয়’।

বিএমডিসি সূত্রে জানা যায়, শুধুমাত্র এফসিপিএস, পিএইচডি, এমডি, এমএস, এমফিল, আর কিছু ডিপ্লোমা ডিগ্রী বাংলাদেশের ডাক্তারদের জন্য স্বীকৃত ডিগ্রী। এসব ডিগ্রীধারী ডাক্তারদের কাছ থেকে চিকিৎসা সেবা নেওয়া উত্তম।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন-২০১০-এর ২৯ (১) ধারায় ভুয়া পদবি, ডিগ্রি ইত্যাদি ব্যবহার নিষিদ্ধের শাস্তির ব্যাপারে বলা হয়েছে। উপধারা (১)-এর এই বিধান কেউ লঙ্ঘন করলে তার শাস্তি হিসেবে উপধারা (২)-এ বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি উপধারা (১)-এর বিধান লঙ্ঘন করলে, তা হবে একটি অপরাধ এবং তার জন্য তিনি ৩ বছরের কারাদন্ড বা ১ লাখ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং অপরাধ অব্যাহত থাকলে, প্রত্যেকবার পুনরাবৃত্তির জন্য কমপক্ষে ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা বর্ণিত দন্ডে অতিরিক্ত হিসেবে দন্ড পাবেন।

জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলা স্বাচিপ সভাপতি ডা: জাকির হোসেন কারেন্ট বার্তাকে বলেন, বিএমডিসির রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত কোন ডাক্তার নির্দেশনা লঙ্গন করা বিএমডিসির আইন পরিপন্থী। বিএমডিসি যেসব ডিগ্রী ব্যবহার না করতে বলছে তা মানতে একাদিকবার সিভিল সার্জন অফিস থেকে ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে চিঠি পাঠানোও হয়েছে। আইন ও নির্দেশনা না মেনে ডিগ্রী না থাকলেও চিকিৎসা সেবা দেওয়া ও অনস্বীকৃত ডিগ্রী ব্যবহার করা উচিত নয়।

এসব বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা বিএমএ সভাপতি ডা: আশফাকুর রহমান মামুন কারেন্ট বার্তাকে বলেন, বিএমডিসির নির্দেশনা মেনে এসব ডিগ্রী ব্যবহার না করাই উত্তম। ডিগ্রী ব্যবহার ছাড়া প্র্যাকটিস নিয়ে বিএমডিসির সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে তা ফলো করা উচিত। রোগীরা যাতে হয়রানীমুক্ত সেবা পেতে পারেন সেজন্য আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে।

লক্ষ্মীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা: আব্দুল গাফ্ফার কারেন্ট বার্তাকে বলেন, বেশ কিছু চিকিৎসক তাদের ডিগ্রি শেষ না হলেও প্যাড বা প্রচারণায় এসব ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। এনিয়ে ওই সব চিকিৎসকদের একাধিকবার নোটিশ করা হয়েছে। এরপরও যদি কেউ এধরনের প্রতারণামূলক ডিগ্রি ব্যবহার করে থাকেন তাদের বিরুদ্ধে বিএমডিসি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আগামী পর্বে আসছে- বিএমডিসির নির্দেশনা মানছেন না যারা, এমবিবিএস হয়েও নিচ্ছেন বিশেষজ্ঞের ফি

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 276
    Shares


এই বিভাগের আরো খবর