• শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১২:২৩ অপরাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English

কালুরঘাট সেতুর টোল নিয়ে চলছে হরিলুট

মোঃ সিরাজুল মনির, চট্টগ্রাম
প্রকাশ হয়েছে : বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১ | ৯:৪৩ pm
                             
                                 

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর উপর অবস্থিত কালুরঘাট সেতুর টোলের অর্থ হরিলুট চলছে গত ৫ বছর ধরে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে সংঘবদ্ধ ঠিকাদার চক্র শুধুমাত্র এই সেতুর টোল আদায়ের অনুমতি নিয়ে নানা কৌশলে হরিলুট করছে বিপুল অংকের অর্থ।

সম্প্রতি করোনাকালীন সময়ে লোকসানের অপকৌশলে প্রায় আড়াই কোটি টাকা মওকুফের আবেদন করেছে চক্রটি। সেই সাথে টোল আদায়ের মেয়াদ আরো ৬৭ দিন বাড়ানোর আবদারও করা হয়েছে।

এর আগে সিন্ডিকেটের এবি কন্ট্রাকশন নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠান সেতু সংস্কারের নামে ৫২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। যা তদন্তের জন্য রেল কর্তৃপক্ষ ও দুদক বরাবরে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের এক আইনজীবী।

এই চক্রটির মূল হোতা চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আইয়ুব আলী। তিনি এই সেতুর টোল আদায়কারী। তবে তার সহযোগীতায় রয়েছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের একাধিক কর্মকর্তা। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছেন- প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ সুবক্তগীন ও প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা কংকন চাকমা।

আর এ ঘটনা তদন্তে তাদের দিয়েই গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। এরমধ্যে চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে তদন্ত কমিটির প্রতি এক মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা থাকলেও তা দাখির করা হয়নি ছয় মাস পরও।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা কংকন চাকমা এ প্রসঙ্গে বলেন, কালুরঘাট সেতুর কোনো ইজারা চুক্তি হয়নি। শুধুমাত্র টোল আদায়ের অনুমতি পেয়েছেন আইয়ুব আলী। কিন্তু টোলের কোনো অর্থ তিনি জমা দেননি। করোনাকালীন সময়ে ৬৭ দিন মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছেন। এ সংক্রান্ত একটি কমিটি করা হয়েছে। এরমধ্যে তিনি আবার ডিজি অফিসে আবেদন করেছেন।

প্রধান প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীন বলেন, তদন্ত কমিটিতে আছি সেটা জানি। কিন্তু কমিটির কার্যক্রম যতটুকু জানি শুরু হয়নি। এমনকি একটি মিটিংও হয়নি। একই মন্তব্য করে রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জিএম স্যার ভালো বলতে পারবেন।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমি সবে যোগদান করেছি। বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনারা লিখেন, তাহলেই তো জানবো। বিষয়টি জেনে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।

অভিযোগ উঠেছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আইন কর্মকর্তা মো. মতিন, প্রধান প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীন ও ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা কংকন চাকমার পরামর্শে চক্রটি করোনাকালীন লোকসানের অজুহাতে ৬৭ দিন সেতুর টোল আদায়ের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য ডিজি ও জিএম বরাবরে আবেদন করে রেলওয়ের আরো সোয়া কোটি টাকার রাজস্ব হরিলুটের পরিকল্পনা চালাচ্ছে। টোল আদায়ের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য মহাপরিচালকের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।

তব গত ৯ আগস্ট প্রেরিতে এক পত্রে টোলের সমুদয় মূল্য পরিশোধের জন্য পুনরায় পত্র প্রদান এবং সাত দিনের মধ্যে সমুদয় অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জমাকৃত অর্থ বাজেয়াপ্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেন রেলওয়ে ডিজি। একইদিনে প্রেরিত অপর একটি চিঠিতে করোনার কারণে সাধারণ ছুটির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টোলের মেয়াদ নির্ধারণ পূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপককে আহবায়ক এবং প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা ও প্রধান প্রকৌশলীকে সদস্য করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

কিন্তু এ কমিটি টোলের মেয়াদ নির্ধারণ করেনি এখনো। যে কারণে রেলওয়ে ডিজির নির্দেশে গত ২৭ আগস্ট পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি দপ্তর থেকে প্রেরিত এক চিঠিতে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এএন এন্টারপ্রাইজকে পাওনা দুই কোটি ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮৬ টাকা প্রদানে সাত দিনের সময় বেঁধে দেয়া হয়।

জানা যায়, ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতু দিয়ে অতিরিক্ত ওজনের পারাপারের সুযোগ দিচ্ছে আইয়ুব আলী। ৭ টনের অধিক মালামাল বোঝাইকৃত যান চলাচলের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ২০-২২ টনের গাড়ি চলার সুযোগ দিচ্ছে মোটা অংকের টোল আদায়ের মাধ্যমে।

অন্যদিকে, আড়াই কোটি টাকা বাকি রেখে লোকসান দেখানোর চেষ্টা চালাচ্ছে আইয়ুব আলী। একইভাবে ঝুঁকি এড়াতে ওজন মাপার স্ক্রেনার বসানোর শর্তে এএন এন্টারপ্রাইজকে কালুরঘাট সেতুর টোলের মূল্য তিন কোটি ৫১ লাখ ৫০ হাজার ৭৮৬ টাকায় নির্ধারণ করে দিলেও রেল কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এখনো স্ক্রেনার মেশিন বসানো হয়নি। এভাবে বিগত ৫ বছরে কৌশলে রেলের এই সেতুর প্রায় ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এর আগে এবি কন্ট্রাকশন নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠান সেতু সংস্কারের নামে ৫২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। বিষয়টি তদন্তের জন্য রেলকর্তৃপক্ষ ও দুদক বরাবরে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের এক আইনজীবী। অথচ অদৃশ্য কারণে এই চক্রের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. আইয়ুব আলী বলেন, করোনাকালীন সময়ে আমি লোকসানের কবলে পড়েছি। যে কারণে সেতুর টোল আদায়ের সময় বাড়ানোর আবেদন করেছি। সেতুর টোলের কিছু টাকা দিয়েছি। বাকি টাকা দিতে সময় চেয়েছি।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 1
    Share


এই বিভাগের আরো খবর