• শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:২৬ পূর্বাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English

গিফট প্রতারণা : কোটি কোটি টাকার লেনদেন অর্ধশত অ্যাকাউন্টে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ হয়েছে : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫:৩৭ pm
                             
                                 

ফেসবুকে বন্ধুত্ব, কখনও প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যোগাযোগ শুরু। এরপর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও আলাপচারিতা। একপর্যায়ে পার্সেল, ডলার, চাকরি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের প্রলোভন। আফ্রিকান নাইজেরিয়ানদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে কোটি কোটি টাকা খুইয়েছেন হাজারও ‘শিক্ষিত’ বাংলাদেশি।

হাতিয়ে নেয়া প্রতারণার কোটি কোটি টাকা লেনদেন ও উত্তোলন হয়েছে বাংলাদেশি অর্ধশত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। ইতোমধ্যে ৩৭টি অ্যাকাউন্টে লেনদেনের তথ্য পেয়ে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

ইতোমধ্যে তাজ মোহাম্মদ নামে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের (ডিবিবিএল) এক দেশি অ্যাকাউন্টধারীকে রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। যিনি প্রতারকচক্রের প্রতারণায় হাতিয়ে নেয়া টাকা লেনদেনে নিজ অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে নিতেন লাখে ১০ হাজার টাকা।

ফেসবুকে বন্ধুত্ব করে গিফট দেয়ার নামে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎকারী বিদেশি প্রতারকচক্রের ১৫ সদস্যকে গত ২৭ আগস্ট রাজধানীর পল্লবীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতার সবাই নাইজেরিয়ার নাগরিক। এক মাসের মধ্যে একই ধরনের প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার ও রিমান্ড শেষে কারাগারে রয়েছেন মোট ৩০ জনের মতো বিদেশি নাগরিক।

এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে সিআইডি’র অ্যাডিশনাল ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার বলেন, গ্রেফতাররা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। তারা ফেসবুকে বন্ধুত্বের নামে অনেকের কাছ থেকে দামি উপহারের লোভ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, লোভের ফাঁদে পড়ে প্রতারিতরা সবাই শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। প্রতারণায় লাখ লাখ টাকা খুইয়েও অনেকে প্রকাশ্যে আসতে চাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, নাইজেরিয়ান এ প্রতারক চক্রের সদস্যের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশি কিছু অসাধু ব্যক্তিও। এর মধ্যে আমরা বেশ ক’জনকে গ্রেফতার করেছি। এর মধ্যে ঢাবির সাবেক শিক্ষার্থী তুর্ণা গ্রেফতারের পর জেলে রয়েছেন। প্রতারণার শুরু ফেসবুকে বন্ধুত্ব দিয়ে। কেউ প্রেমের ফাঁদে, কেউ-বা পার্সেল, ডলার, চাকরি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের আশায় ফাঁদে পা দিয়েছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সিআইডি’র এক কর্মকর্তা  বলেন, নাইজেরিয়ানদের প্রতারণায় ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা হাজারের বেশি। শুধু সশরীরে সিআইডি কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে অভিযোগ করেছেন অর্ধশতাধিক। তাদের অধিকাংশই পাঁচ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খুইয়েছেন।

এমনই এক বেসরকারি এনজিও’র নারী কর্মকর্তা মালয়েশিয়ান এক সুদর্শন যুবকের সঙ্গে প্রেম শুরু করেন। তারপর তারই মোবাইল নম্বর দিয়ে কৌশলে কোড নম্বর নিয়ে তা দিয়ে বাংলাদেশে বসে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খোলেন। এরপর সেই নম্বর থেকে ওই নারীর সঙ্গে আট মাসের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিয়ের কথাবার্তাও হয় ইংরেজি কথোপকথনে। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের এমন মুহূর্তে ফাঁদ পাতা হয়। দেখানো হয় প্রায় ৩৫ হাজার পাউন্ডের নগদ গিফট পাওয়ার সুযোগ। সেই গিফট তুলতে সাড়ে ১১ লাখ টাকা প্রতারকচক্রের অ্যাকাউন্টে পাঠান ওই ভুক্তভোগী নারী। এরপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। পরে তিনি বুঝতে পারেন, তার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। অনলাইনের মাধ্যমে ওই নারী সিআইডিকে বিষয়টি অবহিত করে টাকা উদ্ধারের সহযোগিতা চান।

এ ব্যাপারে সিআইডি’র অ্যাডিশনাল ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার বলেন, নাইজেরিয়ান প্রতারকচক্রটি শুধু বাংলাদেশে নয়, তারা তাদের ব্যবহৃত ল্যাপটপ ও মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে ব্যক্তিগত আকর্ষণীয় ছবি পাঠিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির পর ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ইয়েমেন, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও দুবাইতেও গিফট প্রতারণা করেছে। সেসব দেশে তাদের যোগাযোগ ও যাতায়াতের তথ্যও সিআইডি পেয়েছে। বিভিন্ন দেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে গিফট দেয়ার নামে নিজ নিজ দেশের সহযোগী ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তারা।

তিনি আরও বলেন, নাইজেরিয়ান এসব অপরাধীকে বাংলাদেশি অ্যাকাউন্টধারীরা সহযোগিতা করেছেন। তারা তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন। এমন সুযোগের বিনিময়ে তারা লাখপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে কমিশন পেয়েছেন চক্রটির কাছ থেকে।

রেজাউল হায়দার বলেন, আমরা বিভিন্ন ব্যাংকের যে ৩৭টি অ্যাকাউন্টের তথ্য পেয়েছি, সেগুলো যাচাই-বাছাই হচ্ছে। সেসব অ্যাকাউন্টে কী পরিমাণ লেনদেন হয়েছে, অ্যাকাউন্ট হোল্ডার কারা, কোন অ্যাকাউন্ট থেকে কী পরিমাণ ট্রানজেকশন হয়েছে— এ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে সংগ্রহ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

একই উপায়ে প্রতারণা করায় সিআইডি গত ২ জুলাই তিনজন এবং ২১ জুলাই ১৩ জনকে গ্রেফতার করে। তাদের সঙ্গে গত ২৭ আগস্ট গ্রেফতার ১৫ জনের প্রত্যেকের যোগাযোগ রয়েছে। প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া টাকা গ্রহণে ব্যবহৃত এক বা একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের নামে মিলও রয়েছে— জানায় সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্টরা। জাগো নিউজ

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 4
    Shares


এই বিভাগের আরো খবর