• বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English

চসিক এর পরিচ্ছন্ন বিভাগ অনিয়মে ভরপুর

মোঃ সিরাজুল মনির, চট্টগ্রাম
প্রকাশ হয়েছে : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩:১০ pm
                             
                                 

দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে দুই হাজার পরিচ্ছন্নকর্মীর নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা মোরশেদুল আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে। এর একটি ভাগ গেছে সচিব আবু শাহেদ চৌধুরীর পকেটে এমন অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ঠ পক্ষগুলো থেকে।

শুধু তাই নয়, নিজের ছেলে, আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও টাকার বিনিময়ে অনুমোদনের অধিক শ্রমিক নিয়োগ, সার্টিফিকেট জালিয়াতি, বেতনের টাকা আত্মসাতের নানা ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে তার এইসব অর্পকমের পেছনের শক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন সচিব আবু শাহেদ চৌধুরী।

অভিযোগ উঠেছে, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা না হলেও পরিচ্ছন্ন বিভাগের প্রায় সবকিছুই উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা মোরশেদুল আলম চৌধুরী নিয়ন্ত্রণ করেন। সিটি করপোরেশন শ্রমিক-কর্মচারী লীগের (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে জ্যেষ্ঠতার নীতি লঙ্ঘন করে উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তার পদ ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে মোরশেদুলের বিরুদ্ধে।
গত ১৮ অগাস্ট ‘ডোর টু ডোর’ এ কর্মরত শ্রমিকদের যাচাই-বাছাই এর জন্য প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মুফিদুল আলমকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে অতিরিক্ত প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির চৌধুরী ও উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো. মোরশেদুল আলম চৌধুরীও ছিলেন।

উক্ত তদন্ত কমিটিতে থাকা খোদ মোরশেদুল আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও চসিক প্রশাসকের অভিযোগ দিয়েছে ভুক্তভোগীরা। যেখানে প্রভাব খাটিয়ে ছেলে নাজমুল হাসানকে পরিচ্ছন্ন সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও তার গ্রামের বাড়ি বাঁশখালী উপজেলার ইলশা গ্রামে দুই কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি, নগরীর পূর্ব বাকলিয়ার কালামিয়া বাজারে পাঁচতলা বাড়ি, অনন্যা আবাসিকে দুইটি প্লট, স্ত্রী-সন্তান ও বেনামে কোটি কোটি টাকা রাখার অভিযোগও রয়েছে মোরশেদের বিরুদ্ধে।

‘ডোর টু ডোর’ এ কর্মরত শ্রমিকদের নিয়োগে দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নগরের ১০ নং উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্ন সুপারভাইজার হারুনর রশীদ। তাকে সচিবালয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন সুপারভাইজার হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়। যদিও পরিচ্ছন্ন সুপারভাইজার হওয়ার জন্য যোগ্যতা এইচএসসি পাস আবশ্যক।

তিনি সেবক পদের জন্য যে আবেদন করেছিলেন, সেখানে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ আছে অষ্টম শ্রেণি পাস। ১৯৯৯ সালে তিনি দাখিল পাস করেছেন মর্মে সনদ দাখিল করেন সিটি করপোরেশনে কাছে। কিন্তু ১৯৯৮ সালে তিনি নবম শ্রেণিতে পড়েন বলে লিখিতভাবে জানান রায়পুর ইউনিয়ন বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, ১৯৯৯ সালে কীভাবে তিনি দাখিল পাস করেন? আর এমন অসম্ভব কাজকে সম্ভব করার অভিযোগ উঠেছে পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে। এরকম আরও অন্তত ৫০ জন শ্রমিকের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে সুপারভাইজার বানানোর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। মোরশেদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, সচিবালয় বিভাগকে এড়িয়ে নিজে মেয়রের কাছে ফাইল নিয়ে গিয়ে ‘ব্যবস্থা নিন’ লিখে নেন তিনি। তারপর সেটাকে পুঁজি করে হাতিয়ে নেন টাকা।

সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের আমলে ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দুটি শর্তে দুই হাজার দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দেওয়ার অনুমতি প্রদান করে। শর্তানুসারে দুই হাজার শ্রমিকের জায়গায় নিয়োগ দিয়েছে ২ হাজার ৬৫ জন এবং এখনও পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ে শ্রমিকদের তথ্য জমা দেয়নি চসিক।

এমনকি সংস্থাটির নিজের কাছেও নিয়োগকৃত শ্রমিকদের ছবিসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই। তবে প্রতিমাসে দুই কোটি টাকারও বেশি বেতন দেওয়া হতো শুধুমাত্র শ্রমিকদের সংখ্যা উল্লেখ করেই। তাছাড়া মাস প্রতি প্রদেয় বেতনের মোট টাকায়ও নেই সামঞ্জস্য।
এছাড়াও সবাই একসাথে ‘ডিউটি’ করে না, ফলে এক শ্রমিককে কয়েকবার হাজিরা দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়। মাসের পর মাস পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যার বিপরীতে তদন্ত দলকে কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি পরিচ্ছন্ন বিভাগ।

তবে সাবেক মেয়রের মৌখিক নির্দেশের কথা বলেই সব ধরনের অসচ্ছতার দায় সেরেছেন পরিচ্ছন্ন বিভাগের দায়িত্বশীলরা। এমনটাই জানা গেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। সরকারি সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে যা নিয়ম রয়েছে তার কোনটাই মানা হয়নি ডোর টু ডোর পরিচ্ছন্নকর্মীদের নিয়োগের সময়। নিয়ম রক্ষার একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে দায় সেরেছে সংস্থাটি। এমনকি বিজ্ঞাপনটিতে উল্লেখিত শর্তাবলীর কোনটাই মানার প্রমাণ পায়নি তদন্ত কর্মকর্তারা।
অভিযোগের বিষয়ে চসিকের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম চৌধুরী বলেন, তদন্ত কমিটিতে আমিও ছিলাম। আমাকে কিছু না জানিয়ে শুধু স্বাক্ষর নিয়েছে আমার কাছ থেকে। তদন্ত প্রতিবেদনটি আমি পাইনি। পাওয়ার পর বলতে পারবো।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মুফিদুল আলম বলেন, উপ পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা সব পড়েই প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে তার আপত্তি ছিল। তদন্ত করে আমরা যেসব অনিয়ম বা চিত্র পেয়েছি তা আমরা দিয়েছি, এখন কী ব্যবস্থা নেওয়ার সেটা সচিব নিবেন।

চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, আমি তদন্ত কমিটি করেছি, কিন্তু এখনো হাতে পাইনি। আর সব বিষয়ে যদি আমাকে জড়ান তাহলে আমি কাজ করতে পারবো না, আমি রোগা মানুষ। তবে যাদের বিষয়ে অভিযোগ আসছে, তদন্ত করে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নগরবাসীর দাবি আগে পরিচ্ছন্ন কর্মিরা ড্রেন পরিস্কারের জন‍্য প্রতিদিন দেখা গেলে ও নির্বাচিত মেয়র চেয়ার ছেড়ে যাওয়ার পর এখন এরা সপ্তাহে একদিন করে পরিচ্ছন্নতার কাজে আসে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 5
    Shares


এই বিভাগের আরো খবর