• শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ০১:৫৪ অপরাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English

দালাল নির্ভর বিআরটিএ চট্টগ্রাম অফিস

মোঃ সিরাজুল মনির, চট্টগ্রাম
প্রকাশ হয়েছে : মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২০ | ৩:৫৮ pm
                             
                                 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম অঞ্চলের কার্যালয়ের পাশে জেঁকে বসেছে অনেকগুলো ইন্সুরেন্স কোম্পানি ।মোটর ইনস্যুরেন্স সার্ভিস করে দেয়ার কথা বললেও মুলত এসব বিমা কোম্পানির আড়ালে সেখানে চলছে দালালদের কার্যক্রম।আর এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও অনেকটা রহস্যজনক।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সাথে গড়ে উঠেছে একাধিক বিমা কোম্পানির অফিস।এসব বিমা কোম্পানির কাজ শুধু মোটর ইন্সুরেন্স ইস্যু সংক্রান্ত হলেও কার্যত এসব অফিস এখন পেশাদার দালালদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।যানবাহনের ইন্সুরেন্স অফিসের আড়ালে এসব অফিসে দালালের মাধ্যমে করা হয় বিআরটিএ যাবতীয় কাজ।

নামে বেনামে গড়ে উঠা এসব বিমা অফিসগুলো যেন এক বিকল্প বিআরটিএ। একটি গাড়ি রাস্তায় চলাচলের জন্য রুট পারমিট, ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস সনদ, রেজিস্ট্রেশন, ইন্সুরেন্স সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ডিজিটাল নম্বর প্লেটসহ যতো কাগজ প্রয়োজন হয় তার সবই সরবরাহ করছে বিমা কোম্পানির এই দালাল চক্র।এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন যাবত বিআরটিএ অফিসে আগত সেবা প্রার্থীদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি অসাধু চক্র।

জানা যায়, এমন কিছু অভিযোগে গত ৭সেপ্টেম্বর বিআরটিএ চট্টগ্রাম’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সেখানকার ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স নামে একটি বিমা অফিসে অফিসে অভিযান চালিয়ে সিলগালা করে দেন। পাশাপাশি বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ও সতর্ক করে দেয়া হয়। তবে এরপরেও থামছেনা ইন্সুরেন্স কোম্পানি অফিসের এসব দালালরা। সরকারি এই সেবাদানকারী এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ের পাশে লাগানো এক্সপ্রেস ইন্সুরেন্স,কর্ণফুলী ইন্সুরেন্স, প্রভাতী ইন্সুরেন্স সহ বিভিন্ন বিমা অফিস ঘুরে দেখা যায়,প্রত্যেকটি বিমা অফিস ঘিরে আছে একাধিক দালালের সরব উপস্থিতি। এনিয়ে কথা হয় এক্সপ্রেস লাইফ ইন্সুরেন্স অফিসে থাকা দালাল আব্দুল আউয়াল এর সাথে।তিনি জানান বিআরটিএ সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ তিনি করতে পারেন।তার মাধ্যমে গেলে বিআরটিএতে কোন হয়রানির শিকার হতে হয়না ।তিনি একটু টাকা বেশি নিলেও কাজ করে দেন যথাসময়ে।

এদিকে এই প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে তিনি কথা বলেন পটিয়া থেকে লাইসেন্স করতে আসা ফখরুলের সাথে।তাকে ভিজিটিংকার্ড দিয়ে এই দালাল বলেন,শুধু মোটরচাইকেলের লাইসেন্স করাতে হলে লাগবে ১০ হাজার টাকা আর হালকা যানসহ হলে লাগবে ১২ হাজার টাকা।আইডি কার্ডের ফটোকপি, ১০কপি ছবি আর রক্তের গ্রুপের কাগজ জমা দিলে বাকি কাজ এদের।পরীক্ষার দিন সকালে তার সাথে দেখা করে হলে ঢুকতে হবে। আর এক্ষেত্রে অটোমেটিক পাশ আসবে। এছাড়াও বিদেশে থাকা আতিকুল্লার বড় ভাই নুর মোহাম্মদের মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স তার অনুপস্থিতিতেই নবায়ন করতে পারবেন বলে জানান এই দালাল । তবে এরজন্য সার্ভিস চার্জ লাগবে ৭ হাজার টাকা।

ঠিক একইভাবে কথা হয় শরীফ নামে এখানকার আরেক দালালের সাথে । প্রভাতী লাইফ ইন্সুরেন্স নামেপাশের একটি বিমা প্রতিষ্ঠানে থাকা এই দালাল জানান, তাদের অফিস থেকে সীমিত দামে রুট পারমিট, ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস সনদ, রেজিস্ট্রেশন, ইন্সুরেন্স সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ডিজিটাল নম্বর প্লেটসহ বিআরটিএ’র যাবতীয় কাগজ করে দেয়া হয়।বিগত ১০ বছর ধরে তারা বিশ্বস্ততার সাথে এসব কাজ করে আসছেন।
জানা যায়,নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের পর চট্টগ্রাম বিআরটিএ থেকে এসব দালাল উচ্ছেদ,সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোসহ প্রতিষ্ঠানটির সেবার মান বৃদ্ধি করতে নিয়োগ দেওয়া হয় একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট।দালাল ঠেকাতে গত বছর সিল গালা করে দেয়া হয় বিআরটিএ কার্যালয়ের ভেতরে থাকা দুটি দোকান।আটক করা হয় বেশ কয়েকজন দালালকে।ম্যাজিস্ট্রেটের একের পর এক অভিযানের ফলে দালালরা এখন বিআরটিএ কার্যালয় ছেড়ে অবস্থান নিয়েছেন আশেপাশের এসব ইন্সুরেন্স অফিসগুলোতে।বিআরটিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে চালিয়ে যাচ্ছে এসব অপকর্ম।

বিআরটিএতে সেবা নিতে আসা অধিকাংশের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে না গেলে অফিসে পদেপদে হয়রানির শিকার হতে হয়।সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও ছোটখাটো একটি সমস্যা দেখিয়ে তাদের বের করে দেওয়া হয়।আবার বের হয়ে যখন ইন্সুরেন্স কোম্পানির এসব দালালদের মাধ্যমে যাওয়া হয় তখন সব ঠিক থাকে।বিনিময়ে কাজ ভেদে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, অতিরিক্ত এসব টাকার অংশ বিআরটিএ কর্মকর্তারা না পেলে তাদের দালালদের মাধ্যমে আসতে বাধ্য করতেন না।

তবে বিআরটিএ কর্মকর্তাদের সাথে বিমা কোম্পানির এসব দালালের যোগসাজশের বিষয় অস্বীকার করে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক(ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন ‘আমাদের কোন কর্মকর্তার সাথে দালালের সম্পর্ক নেই ।বিভিন্ন জায়গা থেকে সেবা নিতে আসা লোকজন নিজেরাই দালালের আশ্রয় নিয়ে থাকে।এরপরেও আমাদের কোন কর্মকর্তার এতে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিবো।

এদিকে ইন্সুরেন্স কোম্পানির এসব দালালদের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ চট্টগ্রামের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুরে জামান বলেন,’বিআরটিএ আঙিনা হতে দালাল উচ্ছেদে আমরা একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছি।বেশ কয়েকজনকে আটকও করেছি।অভিযান অব্যাহত রয়েছে।যেখানে অভিযোগ পাওয়া যাবে সেখানেই আমরা অভিযান পরিচালনা করবো।’
সরকারি এসব কর্মকর্তারা দালালদের সাথে তাদের সখ‍্যতার কথা অস্বীকার করলেও ভুক্তভোগীরা জানায় দালালদের নেয়া অবৈধ টাকার একটা বড় অংশ অফিসারদের কাছে পৌছালই সব কাজ ঠিকঠাক মত হয়। যদি টাকা না পৌছে তাহলে দিনের পর দিন বিআরটিএ অফিসে ধনাা দিলেও কাজ হয় না।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 5
    Shares


এই বিভাগের আরো খবর