• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১০:২৩ অপরাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English

আনারসের রাজধানী মধুপুর গড়

রাস্তা খারাপ থাকায় ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত চাষীরা

হাফিজুর রহমান, টাঙ্গাইল
প্রকাশ হয়েছে : বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২০ | ৭:১৫ pm
                             
                                 

রসালো ফল আনারসের রাজধানী মধুপুর গড়। অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে গড় এলাকার লালমাটির প্রধান কৃষি ফসল আনারসের। লালমাটির আনারসের স্বাদ ও ঘ্রান অতুলনীয়। স্বাদে ভরা আনারস। স্বাদ থাকার কারণে শিয়াল ইঁদুর বানরের উপদ্রব বেশি। ঘ্রান গন্ধ থাকার ফলে মৌমাছির আনাগোনা লক্ষনীয়। এ এলাকার কৃষক থেকে শুরু করে নানা শ্রেণী পেশার মানুষের স্বাদের ফল আনারস। রাস্তা খারাপ থাকায় ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এ অঞ্চলের চাষীরা।

কেউ কেউ স্বাদ ও গন্ধের কারণে পেটভরে আনারস খেয়ে থাকে। জ্বর ও হজম শক্তির জন্য চিকিৎসকরা আনারস খাওয়ার পরামর্শ দেয়। কৃষক থেকে শুরু ক্রেতা বিক্রেতারা আনারস বিকিনিকি করতে অনেকটা স্বাচ্ছন্দবোধ করে।

মধুপুর গড় এলাকার উঁচু লালমাটি আনারস চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। এ জনপদের আবহাওয়া আনারসের জন্য মানানসই। লালমাটির উঁচু এলাকায় সহজে বন্যার পানি উঠে না। কোন কোন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে তেমন ক্ষতি হয়না। গড়াঞ্চলের মধুপুর এলাকার পিরোজপুর, চাপাইদ, চাঁনপুর, আঙ্গারিয়া, পীরগাছা, মমিনপুর, ধরাটি, মালাইদ, বাঘাডোবা, কালিয়াকুড়ি, শোলাকুড়ি, হরিণধরা, চুনিয়া, কাকড়াগুনি, বেদুরিয়া, জালিচিড়া, জলই, গায়রা, সাধুপাড়া, জলছত্র, মাগন্তিনগর, বেরীবাইদ, জয়নাগাছা, আউশনারা, মহিষমারা, আলোকদিয়া, গারোবাজারসহ ঘাটাইল,ফুলবাড়িয়া ও মুক্তাগাছা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে আনারসের চাষ হয়ে থাকে।

কার্তিক মাস থেকে জমি প্রস্তুত করে আনারসের চারা লাগানো শুরু হয়। চলে চৈত্র মাসপর্যন্ত। আনারস চাষে খরচ অনেকটা কম। মধুপুরে ২ ধরনের আনারস চাষ হয়ে থাকে। হানিকুইন ও জায়েন্টকিউ। বৈশাখমাস থেকে আনারস পাকা শুরু হয়। ভাদ্র মাস পর্যন্ত সিজনাল আনারস থাকে। আশ্বিণা আনারস থাকে ২ মাস। স্বাদেরদিক থেকে সিজনালটা বেশি ।

এখন এ এলাকায় চারিদিকে আনারসের মৌ মৌগন্ধ। কৃষকের আনারসকে ঘিরে ব্যস্ত সময় পার হচ্ছে। কাকডাকা ভোর থেকে আনারস বাগান থেকে কেটে সাইকেলভ্যান রিক্সা ঘোড়ারগাড়ী যোগেবাজারে নিয়ে আসে। সকাল থেকেই শুরু হয় বেচাকেনা। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বাজার। প্রতিদিনই বসে আনারসের বাজার।
মধুপুরের মধ্যে সবচেয়ে আনারসের বড় বাজার জলছত্র, মোটেরবাজার, গারোবাজার, অন্যদিকে ঘাটাইল, ফুলবাড়িয়া, সাগরদিঘিসহ নানা স্থানেও রয়েছে ছোট-বড়বাজার। এসব বাজার থেকে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকাররা এসে আনারস ক্রয় করে থাকে। ট্রাক যোগে রাজধানী ঢাকাসহ সিলেট, চট্রগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নাটোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বরিশাল. খুলনা, মেহেরেপুর, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়এ এলাকার আনারসের সমাগম ঘটে থাকে।

এবার আনরসের দাম ভাল বলে জানালেন গড় এলাকার কৃষকরা। সরজমিনে মধুপুর শহর ৬ কিঃমিঃ দূরে জলছত্র আনারস বাজারে স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আনারসের দাম ভাল। ভাল দাম পেয়ে কৃষকের মুখে হাসি দেখা গিয়েছে। এ এলাকার আনারস চাষে এক সময় কোন সার ব্যবহার করা হতোনা। চারা লাগানোর পর প্রাকৃতিকভাবেই ফলন হতো। বিনাসারেবা জৈব সারে উৎপাদিত আনারস ছিল স্বাদে ভরা। এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আনারস চাষে ব্যবহার করা হচ্ছে সার ।

কৃষকরা ধানপাটের পাশাপাশি আনারসের বাগানে সার ব্যবহার শুরু করে। ফলে স্বাদের ঘাটতি হয়না। মধুপুর গড় এলাকার অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে কৃষি। এর মধ্যে প্রধান ফসল হচ্ছে আনারস ও কলা।

জলছত্র বাজারে আনারস বিক্রি করতে আসা কৃষক আব্দুল বাছেদ জানান, তিনি এবার ৬ বিঘা জমিতে আনারস চাষ করেছেন। প্রতিটি আনারস বাজারে এনে ২০-২৫ টাকা দামে বিক্রি করছেন। তিনি জানালেন, এবার অন্যান্য বছরের চেয়ে আনারসের দাম ভাল পাচ্ছেন। মুস্তফা ফকির জানান, তার ৪ বিঘা জমিতে ১০ হাজার আনারস ধরেছে। সাইকেল দিয়ে প্রতিদিন বাজারে এনে ২৮-৩০ টাকা দামে বিক্রি করছেন।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল না থাকার কারণে প্রতিটি আনারস বাজারে আনতে খরচ হচ্ছে ৪ টাকা। উজ্জ্বল জানান, তার ২০ বিঘা জমিতে ৪০হাজার আনারস ধরেছে। ২০-২৫টাকা দামে বিক্রি করছেন।
আব্দুল আজিজ জানান, এবার আনারসের দাম মোটামুটি ভাল। আনারসের আকার অনুযায়ী তিনি ১৫ টাকা থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারছেন।

কৃষক ফরমান আলী জানান, তাদের এলাকায় কাঁচা রাস্তা বৃষ্টি হলে কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। বাজারে আনারস তুলতে অনেক কষ্ট করতে হয়। ভ্যান দিয়ে আনারস আনা যায়না। তাই সাইকেলে করে বাজারে আনারস আনেন। তারা জানালেন, একটি আনারস উৎপাদন করে বিক্রি পর্যন্ত তাদের ১০-১২ টাকা খরচ হয়।
হাবিজুল ইসলাম জানান, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, মধ্যসত্ব্য ভোগীদের দৌরাত্ব্য, সার বিষের ব্যবহারের কারণে খরচবৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত আনারসের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

মধুপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মাহমুদুল হাসান জানান, এ বছর মধুপুর এলাকায় ৬ হাজার ১শ হেক্টর জমিতে আনারস চাষের লক্ষ্য মাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদন হয়েছে ৫হাজার ৮শ ৫০ হেক্টর। জায়েন্টকিউ ৪হাজার ২শ ৫০ হেক্টর এবং হানিকুইন ১৬শ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ১লক্ষ ২৯হাজার ১শ ১২ মেট্রিকটন। যার বাজার মূল্য ২০০-২৫০ কোটি টাকা।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 3
    Shares


এই বিভাগের আরো খবর