• বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:২৩ পূর্বাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English

অদৃশ্য খুটির জোরে ভূমিদস্যু মজিদের দাপট অব্যাহত

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ হয়েছে : রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১১:৫৩ pm
                             
                                 

  •  সরকারি সম্পত্তি দখল করেও দাপুটে ভুমিকায় মজিদ
  •  ঈদগাহ, মসজিদ, ও সরকারি ক্লিনিকের জমি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নিজের মালিকানা দাবি
  • এসিল্যান্ডের দেয়া প্রতিবেদন ভূল বলে প্রচার : মামলার হুমকি
  • অতিষ্ঠ শতাধিক পরিবার : ভুক্তভোগীদের থানায় জিডি

সরকারি সম্পত্তি দখল করে মার্কেট নির্মাণ, অন্যের জমি দখল, মিথ্যা মামলা দিয়ে নিরীহ মানুষদের হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অদৃশ্য খুটির জোরে দাপট অব্যাহত রয়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান মাঝিপাড়া এলাকার আব্দুল মজিদ নামে এক ভূমিদস্যুর। ভূমি খেকো আব্দুল মজিদের অত্যাচারে দিনরাত চরম অশান্তিতে ভুগছেন শালবাহান এলাকার শতাধিক পরিবার। অতিষ্ঠ আর নিরুপায় হয়ে হয়রানিসহ এসব অত্যাচারের প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর গণঅভিযোগ দাখিল করেছেন তারা।

গণঅভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাসুদুল হক একটি তদন্ত প্রতিবেদন দিলেও সে প্রতিবেদন ভুল বলে প্রচার করছেন, সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। সেই সাথে এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকিও দিয়েছে। এরপরও থেকে নেই মজিদের দাপট। তিনি অভিযোগকারিদেরও নানা সময় হুমকিধামকি অব্যাহত রেখেছেন। তাদেও দেখলেই গালাগালি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এনিয়ে ৫ সেপ্টেম্বর তেঁতুলিয়া মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল্লা হেল বাকী, শামসুল হক ও আবু তাহের নামে তিন ভুক্তভোগী। ভূমি দস্যু মজিদ ও তার সহযোগিদের অত্যাচারে অসহায় জীবন-যাপন করছেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল্লা হেল বাকী।

সরেজমিনে ঘুরে ভুক্তভোগীসহ ওই এলাকার বিভিন্নজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, আব্দুল মজিদ দুর্দান্ত গোচের ভূমিদস্যু। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও তিনি ব্যবসায়ী পরিচয়ের আড়ালে মূলত জমি জালিয়াতিসহ নানা অপকর্মে জড়িত। সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে এবং কৌশলে স্থানীয়দের ফাঁসিয়ে বিপদে ফেলেন। তাদের নানাভাবে হয়রানিসহ একপর্যায়ে তাদের কাছ থেকে আদায় করেন মোটা অংকের অর্থ। তিনি এই এলাকার সুলতান আলীর পুত্র।

তার অত্যাচারে ভিটেমাটি ও জমি হারিয়েছেন স্থানীয় অনেকে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়েতিনি এই অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন। এই সংঘবদ্ধের চক্রের মধ্যে স্থানীয় হেলাল উদ্দিন, শাহ আলম বাবুল, নুরুল ইসলাম ও ইউপি মেম্বার ফজলুল হকের নামও রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এদের অত্যাচারে নানান শঙ্কায় কাটছে ভুক্তভোগীদের দিন-রাত। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাননি তারা। উল্টো আব্দুল মজিদের কাছ হতে হুমকি প্রদর্শিত হয়েছে। ভুক্তভোগীরা অবশেষে প্রতিকার চেয়ে ভূমিমন্ত্রী, দুদক মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দফতরে গণ-অভিযোগ দিয়েছেন। মজিদের অব্যাহত হুমকিতে গত ৫ সেপ্টেম্বর তেঁতুলিয়া মডেল থানায় নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি দাখিল করেছেন তারা।

অভিযোগে জানা গেছে, আব্দুল মজিদ স্থানীয় স্থানীয় ঈদগাহ, মসজিদ, মাদরাসা ও সরকারি ক্লিনিকের জন্য অন্যের দানকৃত জমির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নিজের মালিকানা দাবি করেন। এলাকার একাধিক মানুষের বসতভিটা নিজের দাবি করে মামলা করেন। সড়কের পাশে সরকারি খাস জমি দখল করে নিজে মালিক সেজে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে স্থানীয়দের বরাদ্দ দেন। শালবাহান রোড বাজারের মূল্যবান সরকারি জায়গায় অবস্থিত দোকানের পাশের জায়গাও তিনি বিক্রি করেন তিনি। স্থানীয় প্রভাবশালী ও সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে দীর্ঘ দিন ধরেই চালিয়ে যাচ্ছেন এমন অপকর্ম। নিরীহ মানুষদের জমিসংক্রান্ত প্যাঁচে ফেলে সুযোগ বুঝে তাদের কাছ থেকে আপোষ রফা করে আদায় করেন মোটা অঙ্কের টাকা।

শালবাহান রোড এলাকার শ্রমজীবী নারী আয়েশা খাতুন জানান, তার কেনা ১০ শতক বসতভিটার ওপর মজিদের চোখ পড়ে। এরপর তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি শুরু করেন। স্বামীহারা ওই নারী নিজেই আয় করে মজিদের সাথে মামলা পরিচালনা করেছেন। এরকম অভিযোগ বিধবা আনোয়ারা বেগমেরও। তিনি জানান, আমার বসতভিটা ২২ শতক জমি থেকে আব্দুল মজিদ গত বছর ছলচাতুরি করে সোয়া ৬ শতক জমি ক্রয় করে নানারকম হুমকি দিয়ে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দিতে পায়তারা করতেছে। আমি অসহায় বিধবা নারী, কষ্ট করে জীবনযাপন করতে হচ্ছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল্লাহ হেল বাকী বলেন, শালবাহান রোড বাজারে আমার ক্রয়কৃত সাড়ে ৫ শতক জমি এই ভূমিদস্যু বেদখল নেয়ার জন্য আমাকে নানাভাবে প্রকাশ্যে মারমুখী আচরণ করছে। খুব আতঙ্কে আছি। বাধ্য হয়ে নিরাপত্তার জন্য থানায় জিডি করেছি। এছাড়া তিনি শালবাহান রোড জামে মসজিদের সভাপতি। মসজিদ ও ঈদগাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই মসজিদের জমি স্থানীয় এক ব্যক্তি দান করেছেন। কিন্তু গোপনে ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে আব্দুল মজিদ এখন মসজিদ ও ঈদগাহের জমিও তার দখলে নিয়েছেন। মসজিদ এবং ঈদগাহের জমি নিজের দাবি করে তিনি আমাদের নামাজে আসতেও বাধা দিচ্ছেন।

ক্লিনিক প্রসঙ্গে মো. ইসলাম বলেন, এই ক্লিনিকের জমি আমার বাবা সোহরাব আলী দান করে গেছে। কিন্তু আব্দুল মজিদ এখন দাবি করছে জমিটি তার। এখন সে ক্লিনিকের জমি দাবি করছেন। ক্লিনিকের জমি নিয়ে ইউপি সদস্য ফজলুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

মাঝিপাড়ার আজিজুল হক বলেন, ১৯৯৫ সালে আমি ও আমার বড় ভাই শামসুল হক ওই আব্দুল মজিদের নিকট হতে ২৪ শতক জমি ক্রয় করি। প্রায় ২৫ বছর ধরে ভোগ দখল করে আসার পর হঠাৎ করেই আব্দুল মজিদ এ জমি তার স্ত্রীর বলে দাবি করছে। জমি ছেড়ে দিতে হুমকিসহ মামলা-মোকদ্দমার ভয় দেখা দেখাচ্ছে। মজিদের অত্যাচারে চরম অসস্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। শুধু আমি না, আমার শতাধিক ভুক্তভোগী।

অভিযোগ রয়েছে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এক কর্মচারি সাথে যোগসাজস করে মোটা অংকের টাকা বিনিময়ে দখলে না থাকা একাধিক জমিও আব্দুল মজিদের নামে খারিজ খতিয়ান করা হয়েছে। আব্দুল মজিদের বিরুদ্ধে আয়েশা খাতুন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল্লা হেল বাকীর মতো অভিযোগ অনেকের। একই এলাকার শামসুল হক, হাফেজ মো.আব্দুল মান্নান, আবু তাহের, আব্দুল কুদ্দুস, হুসেন আলী, মল্লিকা পারভীনসহ অনেকে তার বিরুদ্ধে ভূমি দস্যুতার অভিযোগ করেছেন।

এদিকে ভুক্তভোগীদের গণ স্বাক্ষরিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে তদন্তের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি তদন্ত করে একটি প্রতিবেদনও দাখিল করেন। এই প্রতিবেদন ভূল আখ্যায়িত কওে প্রচারণাসহ সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় তিনি এসিল্যান্ডের নামে মামলা করারও হুমকি দেন। সরকার সম্পত্তি (এনিমি) ২৬ শতাংশ জমি আব্দুল মজিদ অবৈধভাবে দখল করে সরকারের ভূমি বিভাগে একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাকে দেখে নেয়ার হুমকি মুলত ভূমিদস্যু আব্দুল মজিদের অদৃশ্য খুটির জোরের বহিঃপ্রকাশ।

অন্যদিকে স্থানীয়রা জানায়, চরিত্রগত কারণেও ভূমিদস্যু আব্দুল মজিদের অনেক নাম ডাক রয়েছে। তার বিরুদ্ধে রয়েছে ধর্ষণের মামলা। সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে কৌশলে আপন চাচীকে বিয়ে করেন। তার আত্মীয় স্বজনরাও বাদ যায়নি তার অত্যাচার থেকে।
আব্দুল মজিদের এক চাচা আব্দুল কদ্দুস বলেন, মজিদ আমার আপন ভাতিজা। ব্যাংকের মাধ্যম ঋণ করিয়ে ৬০ হাজার টাকা নিয়েছেন, এখন অস্বীকার করছেন। ২০১৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর শালবাহান অগ্রণী ব্যাংক (হিসাব নং৭৮৫৯) হতে ৬০ হাজার টাকা লোন করি। কিন্তু সে টাকা আমার কাছে ধার নিয়ে এখন অস্বীকার করেন।

তবে তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে আব্দুল মজিদ জানান, এসব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। প্রথমে জমিগুলো যার কাছ থেকে কিনেছি তার কাগজপত্র ঠিক ছিল না। পরে সেই জমি আবারো আমার স্ত্রীর নামে কিনি এবং এখন কাগজপত্র সব ঠিক আছে। আর এসব জমির প্রতিটি কাগজ আমার কাছে রয়েছে। সরকারি সম্পত্তি (এনিমি প্রপার্টি) বলে যে জমিগুলোর কথা বলা হচ্ছে সেগুলো আমার কেনা জমি।

উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মাসুদুল হক বলেন, শালবাহান রোড এলাকার আব্দুল মজিদ নামে একজনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ করা হলে ঘটনা তদন্তে অভিযোগটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়। পরে সে অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে এবং সে হিসেবে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়েছে।

চলবে….

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 21
    Shares


এই বিভাগের আরো খবর