• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০১:২৭ পূর্বাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English

করোনা প্রতিরোধে শিবচরের আইসোলেশ কেন্দ্র কার্যকর ভূমিকায়

কমেছে সংক্রমনের হার, বাঁচছে মুল্যবান জীবন

ম.ম.হারুন অর রশিদ, মাদারীপুর
প্রকাশ হয়েছে : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১:৪৭ pm
                             
                                 

৬০ উর্ধ্ব মজিবর রহমান ঢাকায় হার্ডওয়ার ব্যবসায়ী।প্রচন্ড জ¦র অনুভত হওয়ায় ভরসা রাখতে পারেননি ঢাকার নামী দামী হাসপাতালগুলোর উপরে । চলে আসেন গ্রামের বাড়ি শিবচরের শিরুয়াইল ইউনিয়নের পশ্চিম কাকৈর গ্রামে। এসেও বিপাকে পড়েন আড়িয়াল খা তীরবর্ত্তী গ্রামটি নদী ভাঙ্গন ও বন্যা কবলিত হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন মজিবর ও তার পরিবার। জ¦রের সাথে কাশির পরিমান আরো বাড়ায় শিবচর হাসপাতালে গিয়ে করোনার নমুনা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। রিপোর্ট আসে পজেটিভ। তাকে আনা হয়।

শিবচরের বহেরাতলায় করোনা বিশেষায়িত ২০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টারে। প্রায় ১৫ দিন চিকিৎসার পর তিনি আবারো ফিরে গেছেন কর্মস্থল ঢাকায়। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি শিবচর আইসোলেশন সেন্টারের চিকিৎসাসেবা, খাবার ও উন্নত মানের যন্ত্রাংশ পরিবেশে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

ব্যক্তি উদ্যোগে এমন আধুনিক আইসোলেশন কেন্দ্র স্থাপন করায় কৃতজ্ঞতা জানান স্থানীয় সংসদ সদস্যর প্রতি। আরেক রুগী পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের ২৪ বছর বয়সী সৃষ্টি দরানী। মা বাবাসহ পরিবারের সবাই আমেরিকা প্রবাসী। টানা কয়েকদিন জ¦র কাশি ও শ^াস কষ্ট হওয়ার পর একদিন ভোর রাতে প্রচন্ড শ^াস কষ্ট শুরু হলে তাৎক্ষনিকভাবে নেয়া হয় শিবচর ২০ শয্যার বিশেষায়িত করোনা কেন্দ্রে। সেখানে নিয়েই হাই ফ্লো নেজাল কেনোলো থেরাপি সিস্টেমের মাধ্যমে দেয়া হয় পর্যাপ্ত অক্সিজেন।

সার্বক্ষনিক পালস্ অক্সি মিটার,ইনফ্রাডার থা¤্রােমিটার মেশিন,অক্সিজেন জেনারেটর দিয়ে অক্সিজেন মেপে স্বাভাবিক করা হয় । এরপর সে কুর্মিটোলাসহ একাধিক হাসপাতাল ঘুরে এসেও শিবচরের আইসোলেশন সেন্টারের প্রযুক্তিগত সুবিধা সার্বিক সেবাকে জাতীয় মানের বলে উল্ল্যেখ করেন। এভাবেই শিবচরের দক্ষিন বহেরাতলা হাজী আবুল কাশেম উকিল মা শিশু কল্যান কেন্দ্রে স্থাপিত ২০ শয্যার বিশেষায়িত আইসোলেশন কেন্দ্রটি করোনা রুগীদের সুরক্ষা দিয়ে মহামারি থেকে মুক্ত করছে। বিশেষায়িত আইসোলেশন কেন্দ্রটিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর ব্যক্তিগত অর্থায়নে হাই ফ্লো নেজাল কেনোলো থেরাপি সিস্টেম,অক্সিজেন জেনারেটর ,পালস্ অক্সি মিটার,ইনফ্রাডার থা¤্রােমিটার, অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ নানাবিধ সুযোগ সুবিধা সংযোজন করা হয়।

এখানে পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করেন ২ জন চিকিৎসক,২ জন নার্সসহ ৭ জন স্বাস্থ্য কর্মী। ১০ দিন পরপর স্বাস্থ্য কর্মীরা পরিবর্তন হয়ে ১৪ দিন হোটেলে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকেন। রুগীদের জন্য রয়েছে উন্নত মানের খাবার ব্যবস্থাও। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে আইসোলেশন কেন্দ্রটি উদ্বোধন করা হয়। এ পর্যন্ত অর্ধ শতাধিক করোনা রুগী এই আইসোলেশন কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে স্বাস্থ্য বিভাগ সুত্রে জানা গেছে। বর্তমানে ৪ জন রুগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। এখানে বাইরের রুগীদেরও চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।

করোনা আক্রান্ত মজিবর রহমান বলেন , আমাগো এমপি সাহেব শিবচরে যে আইসোলেশন কেন্দ্র খুলছে ,এখানে উন্নতমানের চিকিৎসা সেবা,ওষুধ,খাবার দেয়া হয়। বিশেষ করে করোনা রুগীদের জন্য অক্সিজেন জেনারেটর দিয়ে অক্সিজেন সেখানেই তৈরি হয়। আরেকটি মেশিন দিয়ে মিনিটে ১০ লিটার অক্সিজেন দেয়া হয়। খুবই আধুনিক সুবিধা এখানে। করোনা শোনার পর কোনদিন ভাবতেই পারি নাই বাচমু। এহন শিবচরে চিকিৎসা নিয়াই সুস্থ হইলাম। আমরা আমাগো এমপির লাইগা দোয়া করি।

আরেক রুগী সৃষ্টি দরানী বলেন, প্রচন্ড শ^াস কষ্টে আমি খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। এক সাংবাদিকের সহায়তায় ভোরেই শিবচর আইসোলেশন কেন্দ্রে ভর্তি হই। সেখানে নিয়েই আমাকে হাই ফ্লো নেজাল কেনোলো থেরাপি সিস্টেম দিয়ে অক্সিজেন বাড়ানো হয়। এছাড়াও এখানে অক্সিজেন জেনারেটর ,পালস্ অক্সি মিটার,ইনফ্রাডার থা¤্রােমিটার, অক্সিজেন সিলিন্ডার সব আছে। খাবার মান ও স্বাস্থ্য সেবাও খুব ভাল মানের। পরে আমি কুর্মিটোলা হাসপাতালে গিয়েও শিবচরের ধারে কাছের মতোও সেবা পাইনি।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ শশাঙ্ক চন্দ্র ঘোস বলেন , শিবচরে চীফ হুইপ স্যারের ব্যক্তিগত অর্থায়নে আইসোলেশন কেন্দ্রে যে মেশিনারিজ সংযোজন করা হয়েছে তা জেলা সদর আইসোলেশন কেন্দ্রেও নেই। ডাক্তারদের জন্য এসি থেকে শুরু করে টিভি উন্নতমানের খাবারসহ সব আধুনিক সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ জেলাতেও এমন কেন্দ্র নেই। চীফ হুইপ স্যারের এই বিরল উদ্যোগ শিবচরকে আজ সবার আগে করোনা থেকে রক্ষা করতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ায় দেশে প্রথম লকডাউন করা হয় শিবচরকে । অথচ আজ শিবচরে করোনা সংক্রমন ও প্রতিরোধে সারাদেশে উদাহরনযোগ্য। চীফ হুইপ স্যারের সময়োপুযোগী সিদ্ধান্তে কঠোর লকডাউন, লক্ষাধিক প্যাকেট খাবার ঘরে ঘরে খাবার পৌছে দেয়া,আইসোলেশন কেন্দ্র স্থাপন,সকল ইউনিট সম্বন্বিতভাবে কাজ করে দেশজুড়ে এক অনন্য নাম তিনি। চীফ হুইপ স্যারের নির্দেশনা ও শিবচরের সাফল্যকে সারাদেশে মডেল মানছে স্বাস্থ্য বিভাগ,প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তর।

চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী দলীয় নেতা কর্মী, স্বাস্থ্য কর্মী,প্রশাসন,আইনশৃঙ্খলা বাহিনী,সাংবাদিকসহ সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, করোনা ভাইরাস থেকে আমাদের সাবধানে থাকতে হবে। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে সবাইকে। করোনায় শিবচর দেশে প্রথম লকডাউন হলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলো মানুষ কঠোরভাবে মেনেছে। তাই শিবচরে সংক্রমন রোধ সম্ভব হয়েছে। রুগীদের জন্য আইসোলেশন কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে ভাল চিকিৎসা পাচ্ছে। আমরা করোনাসহ সকল দূর্যোগে আপনাদের পাশে আছি।
উল্লেখ্য, গত ১৯ মার্চ দেশে সর্বপ্রথম প্রবাসী অধ্যুষিত শিবচরকে লকডাউন করা হয়। শিবচরে করোনার বিস্তার রোধে শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রী ও আইইডিসিআরের নির্দেশনা মেনে চলতে চিফ হুইপ নুর-ই-আলম চৌধুরী কঠোর অবস্থান নেন। আড়াই শতাধিক পুলিশ সদস্য , প্রশাসন মোতায়েন করা হয় উপজেলাজুড়ে। একই সঙ্গে কাজ করে অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট ,র‌্যাব,আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ ,পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ,ইউনিয়ন পরিষদ ।

বন্ধ করে দেওয়া হয় দোকানপাট, গণপরিবহন। শুরুতে মাত্র চার ঘণ্টা খোলা থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকান। বন্ধ হয়ে যায় সব সাপ্তাহিক হাট।চিফ হুইপ ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত কমিটি গঠন করে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা প্রবাসী ও দরিদ্রদের খাবার সহায়তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। আক্রান্ত পরিবারগুলোর প্রতি খাদ্য সহায়তায় নজর দেন বিশেষভাবে। মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য দেন ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীসহ (পিপিই) আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র। লক্ষাধিক প্যাকেট খাবার,চাল দফায় দফায় নিয়মিত খাবার সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কারণে কেউ লকডাউন ভেঙে ঘর থেকে বের হয়নি। এ পর্যন্ত শিবচর উপজেলায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ২শ৪১ জন। মারা গেছেন ৬ জন। সুস্থ হয়েছেন ২শ০৪ জন।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 3
    Shares


এই বিভাগের আরো খবর