• রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১১:২০ পূর্বাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English

চট্টগ্রামের বিআইটিআইডি দেশের একমাত্র করোনা চিকিৎসার প্রতিষ্ঠান

মোঃ সিরাজুল মনির, চট্টগ্রাম
প্রকাশ হয়েছে : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:৫৭ am
                             
                                 

দেশে এখন পর্যন্ত এমন প্রতিষ্ঠান আর দ্বিতীয়টি হয়ে ওঠেনি। হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। করোনা-কোভিড-১৯ নিয়ে যে সমস্ত ঘটনা কাহিনী পরম্পরা দেশকে ছাপিয়ে বহিঃবিশ্বে ছড়িয়েছে তাতে এই বিষয়টিতে সর্বাধিক সতর্কতা থাকার কথা। থাকছেও, এমনই পরিস্থিতিতে নানা শংকা আশংকা সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করে আকাশস্পর্শী সাহস নিয়ে বীরদর্পে চলমান আছে এই প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজেস, সংক্ষেপে বিআইটিআইডি, চট্টগ্রাম। দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে নির্ভরতার সাথে নির্ভরশীলভাবে কোভিড-১৯, করোনা পরীক্ষা শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কোনরকম আপত্তি-বিপত্তি ছাড়া নির্ভুলভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। বলা প্রয়োজন করোনা মহামারীর এই মহাদুর্যোগে দেশের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান, চট্টগ্রাম বিভাগে প্রথম যেখানে শতভাগ সাফল্যের সাথে এই পরীক্ষা শুরুর সাহস ও শক্তিমত্তা দেখিয়েছে। সফলও হয়েছে। এখানে গায়েবি, বাতেনি কোন ক্ষমতার দাপটে নয় নিঃস্বার্থে, একেবারেই পরোপকারী মনোভাবে।

গর্ব ও গৌরবের সাথে বলতে হয়, রোগ বিস্তার যখন ব্যাপকতা লাভ করেছে বিধ্বংসী ছোঁয়াছুঁয়ির কারণ ও অজুহাতে চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হাত গুটিয়ে ফেলেছিল, তখন এই বিআইটিআইডি নিজস্ব উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় শুরু করে হাসপাতাল সেবা কার্যক্রম। সরকারের অন্য সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসমূহের ফাঁকা বিছানাতে করোনা রোগীদের ঠাঁই হয়নি। দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করে সামান্যতম অঙিজেন প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা প্রত্যাশা করে বিফল হয়েছে। রাস্তাঘাট, অ্যাম্বুলেন্স, বাসা-অফিস, ফুটপাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। আলিঙ্গন করেছে অসময়ের আপত্তিকর মৃত্যুস্বাদকে। এখানে ধনী-গরিব, বিত্তহীন, সম্পদশালী, পদস্ত, নিম্নপদ, রাজনৈতিক, সমাজকর্মী, আমলা, সেনা, পুলিশ সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে মোকাবিলা করতে হয়েছে অভাবনীয় ভয়ঙ্কর বিপর্যস্ত এই পরিস্থিতি। সেই সংকটময় মহাবিপর্যয়ের বিভীষিকাময় সময়ে বিআইটিআইডি অতি আন্তরিকভাবে নিষ্ঠার সাথে চালু করে স্বাধীন স্বতন্ত্র করোনা হাসপাতাল। পাঠকদের জানানো প্রয়োজন যে এইটি ছিল পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। ফিল্ড হাসপাতালের যে চিন্তাধারা বা কনসেপ্ট তা কিন্তু নয়।

দুর্যোগকালীন বাড়তি প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠা করা বা গজিয়ে ওঠা এই সব হাসপাতাল বা আইসোলেশন সেন্টার বন্ধ হবে। হয়ে যাবে। যাওয়ার তাগিদ আসবে। কিন্তু এই বিআইটিআইডি চলবে দীর্ঘকাল। অনাদিকাল। মানুষের বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থা যতদিন থাকবে, ততদিন। কোভিড-১৯ আক্রান্ত সর্বশেষ রোগীটির নিশানা খুঁজে পাওয়া পর্যন্ত। এখানে পদস্ত চিকিৎসক, শিক্ষক, অ্যাসোসিয়েট, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, সিনিয়র কনসালটেন্ট, প্রশিক্ষিত অভিজ্ঞ নার্সদের সমন্বয়ে পালাক্রমিক ডিউটির মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা প্রদান শুরু করা হয়।

বাংলাদেশের অন্য কোন হাসপাতালে অধ্যাপক পদমর্যাদার চিকিৎসকগণ রোস্টার ডিউটির মাধ্যমে সকাল-বিকাল-রাত্রিকালীন ২৪ ঘন্টা রোগীর শয্যাপাশে স্বশরীরে উপস্থিত থাকার নজির এখানেই। বিরল ব্যতিক্রম বৈকি? সরকারি প্রতিষ্ঠান হয়েও নিরীহ নিরোপায় করোনারোগীর তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে কারো মুখাপেক্ষী না থেকে সম্পূর্ণ নিজস্ব চিন্তা চেতনা, ধ্যান-ধারণার মানবিকতার বহিঃপ্রকাশে সর্বাত্মক সৃষ্টিশীল দৃঢ় ভূমিকা পালন করা হয়েছে। আর তা সম্ভব হয়েছে বিশেষায়িত এই প্রতিষ্ঠানের কর্মোপযোগী মৃদুভাষী উদার নিরহংকারী মানবিক মনের অধিকারী নির্ভরযোগ্য মেধাবী পরিচালক খ্যাতিমান চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আবুল হাসান চৌধুরীর স্বার্থহীন দ্ব্যর্থহীন নিপুণ নেতৃত্বে। সৌভাগ্যের বিষয় পরিচালকের চারপাশ ঘিরে আষ্টেপৃষ্টে লেপ্টেছিলেন বিশেষ গুণসম্পন্ন নির্ভয়ের নির্ভীক ব্যতিক্রমী চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টসহ কিছু স্বাস্থ্যকর্মী। করোনাকে করুণা দেখানোর অভিজ্ঞতা না থাকলেও দ্রুততম সময়ে নিজেদের প্রস্তুত করে মানুষের কল্যাণে, মঙ্গলে প্রয়োজনে আত্মোৎসর্গের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাঁরা। সারা দেশের করোনা রোগীর পরীক্ষার মুখপাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মানবিক এক চিকিৎসক ডা. শাকিল আহম্মদ। ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা তদারকি আর সমন্বয়ের আবেগি দায়িত্ব আন্তরিকে পালন করছেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রণব বড়ুয়া ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশিদ। চিকিৎসা নিরাপত্তা সরঞ্জাম অপ্রতুলতাকে উপেক্ষা করে মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গের মানসিকতা নিয়ে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের মুখোমুখি হয়ে নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরীক্ষাগারের পিসিআর মেশিনের প্রতিটি মুহূর্তকে সাশ্রয়ী হিসাবে দিনরাত নিরলস শ্রম দিয়েছেন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের এক ঝাঁক উদ্যোমী তরুণ।

তখনো দেশের ঢাকা আইইডিসিআর, চট্টগ্রামে বিআইটিআইডি সবেধন নীলমনি, এই দুইখানই সারাদেশের করোনা আক্রান্ত রোগীর আশার প্রদীপ, ভরসারস্থল, নির্ভরতার প্রতীক। বলা যায় এখনো। মাঝখানে যাঁদের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছে। তাঁদের কাণ্ডকারখানার সমসাময়িক ইতিহাসতো আর নতুন করে বুঝানোর কিছু নেই। তবে মুখরোচক আকাঙ্ক্ষিত এইসব কলুষিত খবরে সরগরম থাকা প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার কাটতি বেশ ভালই হয়েছে। জনগণও বুঝতে পেরেছে, শিখেছে, বিপদের বন্ধু কারা, কোথায়, কেন, কেমন করে, কাদের দ্বারা, নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ইতিমধ্যে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে। রাখতে পেরেছে। জানিয়ে দিয়েছে, কিভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নির্ভুল নিরাপদ পথ উন্মোক্ত করতে হয়। জনগণের কাছে আতঙ্ক না হয়ে আস্থা অর্জনের উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে হয়। মানুষের জীবনের অপরিহার্য রক্ষাকবচ হিসাবে নিরঙ্কুশ আনন্দঘন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার মূলমন্ত্র খুঁজে নিতে হয়। রাতারাতি গজিয়ে ওঠা অস্বাভাবিক এইসব পরীক্ষাগার ও প্রতিষ্ঠানের ঠাসাঠাসি ধাক্কাধাক্কির তোয়াক্কা না করে নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে।

সামাজিক দায়িত্ব পালনের দৃশ্যমান সুযোগের পাশাপাশি নিজেদের কাছে এবং কাজে উপেক্ষিত অদৃশ্য নিদের্শনা আদায়ের মোক্ষম সুযোগটি অবলীলায় হাতের মুঠোয় এসেছে। অবাধ এই সুযোগ অহঙ্কারী মনোভাবে হাতছাড়া করে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ধিক্কার তিরস্কারে হাবুডুবু খাচ্ছে। আরো বড় কিছু বাড়তি কিছুর ইঙ্গিত বেশ জোরালোভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানুষের বিপদে ভোগান্তির সময়ে, বিপন্ন বিপর্যস্ত হওয়ার সময়কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে সংকট ঘণীভূত করার খেসারত প্রত্যেক মানুষকে দিতে হবে, দিতে হয়। তা পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে, কড়াকড়িভাবে। আমাদের মধ্যে গোপনে সঙ্গোপনে আহারে বিহারে জাগ্রতে প্রতি কাজে মানুষের কল্যাণ উপলব্ধির উম্মেষ ঘটুক, জাগ্রত হোক, এই প্রত্যাশা করি।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 11
    Shares


এই বিভাগের আরো খবর