• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১০:১৭ অপরাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English

হেফাজত ইসলামের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে তা এখনো অর্নিধারিত !

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ হয়েছে : শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২০ | ৪:৩৭ pm
                             
                                 

হেফাজত ইসলামের আমির মাওলানা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর প্রায় একমাস হতে চললেও এখনো শূণ্য থাকা আমিরের পদ পূরণ হয়নি। আহমদ শফীর মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও তার মৃত্যুর পরপরই হাটহাজারী মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় কমাস আগেও কোণঠাসা থাকা মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীর হাতে। কদিনের মধ্যেই শুরা কমিটির মাধ্যমে তিনি দায়িত্ব পান হাটহাজারী মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস ও শিক্ষা পরিচালকের। যিনি আগে থেকেই হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন প্রয়াত আহমদ শফীর সহযোগি হিসেবে।

আহমদ শফীর মৃত্যুর পর থেকেই কওমি অঙ্গনসহ রাজনীতি সচেতন মহলে ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত কার হাতে উঠছে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলছে। আহমদ শফীকে সারা দেশের কওমি আলেমরা ‘মাথার তাজ’ হিসেবে মানতেন। সেই হিসেবে তিনিই কওমি অঙ্গনের শীর্ষ তিনটি পদেই নেতৃত্বে ছিলেন। তবে এখন সেরকম সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম আর নেই, যাকে সবাই একবাক্যে মেনে নিবেন। যার প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে।

কেননা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুতে কওমি মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষা বোর্ড ‘বেফাক’র শীর্ষ পদটি ইতোমধ্যে পূর্ণ করা হয়েছে। মাওলানা মাহমুদুল হাসানকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে। ফলে পদাধিকারবলে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য সরকার গঠিত সংস্থা আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়ার চেয়ারম্যানও হবেন তিনি।
অথচ হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফী একই সঙ্গে বেফাকের সভাপতি, আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়ার চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল হেফাজতের মহাসচিব বাবুনগরী বেফাকের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন৷ কিন্তু তিন ভোট পেলেও জুনায়েদ বাবুনগরী বলেছেন তিনি নির্বাচনই করেননি। কে বা কারা তার নামে তিনটা ভোট দিয়ে অহেতুক ইস্যু বানিয়েছিলেন।
কওমি অঙ্গনের শীর্ষ আলেমরা আহমদ শফীর মৃত্যুর পর থেকে নানা জাগায় বলে আসছিলেন, আহমদ শফীর মত সর্বজন শ্রদ্বেয় আলেম আর নেই তাই শীর্ষ তিন পদে একজনই যে হবে তা না কিন্তু যার সত্যতা মিলেছে মাওলানা মাহমুদুল হাসানকে বেফাক ও আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়ার চেয়ারম্যান নির্বাচনের মাধ্যমে।

জুনায়েদ বাবুনগরী যখন এই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করেননি তাখনই সব সমীকরণ এখন এক কোণে এসে মিলেছে। তাহলে কি হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বে মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীই আসছেন? আর সেকারণেই সারা দেশে প্রভাব পরিচয় থাকার পরও হেফাজতের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা হয়েও কেন তিনি বেফাকের নির্বাচনে অংশ নেননি। এই সীমকরণ মেলাতে গিয়ে হেফাজত সূত্রগুলো বলছে, হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালনা ভার তিন সিনিয়র আলেম দিয়ে চললেও মূলত সব কিছুর নিয়ন্ত্রক কিন্তু এখন জুনায়েদ বাবুনগরী। কওমিদের মধ্যে অধিকাংশ ছাত্র শিক্ষক সরকারবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন। তাদের মতের সঙ্গে মিল রয়েছে জুনায়েদ বাবুনগরীরও। তাই কওমি অঙ্গনের অধিকাংশ ছাত্র-শিক্ষকই চান বাবু নগরীই হোক হেফাজতের শীর্ষ নেতা তথা আমির।
হেফাজত মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী আমির হলে মহাসচিব করা হবে নায়েবে আমির ও ঢাকার আমির মাওলানা নুর হুসাইন কাসেমীকে। এমন সমীকরণই এগুচ্ছে হেফাজতের সম্মেলনসহ সব কার্যক্রম। অনেক আগেই কথা উঠেছিল হেফাজতের নেতৃত্ব চট্টগ্রামে ব্রেকেটবন্দি কেন থাকবে? কেননা প্রয়াত আহমদ শফী ছিলোন আমির ও জুনায়েদ বাবুনগরী মহাসচিব। এই দুজনই হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। ফলে নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণের হিসেবেও ঢাকার মাওলানা নুর হোসেন কাসেমীকে মহাসচিব হিসেবে দেখা যেতে পারে জুনায়েদ বাবু নগরী যদি আমির নির্বাচিত হন।
জানা যায়, ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয়েছিল চট্টগ্রামকেন্দ্রিক কওমি আক্বীদাপন্থি অরাজনৈতিক ইসলামী সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। যদিওবা পরে অরাজনৈতিক এ সংগঠনটি রাজনৈতিক ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। হটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার প্রয়াত প্রধান পরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফিকে আমির ও মাদ্রাসার তৎকালীন সিনিয়র মুহাদ্দিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে মহাসচিব করে হেফাজতের ২২৯ সদস্যের মজলিশে শুরা কমিটি গঠন করা হয়েছিল সেই সময়। দেশ বরণ্য শীর্ষ আলেম আহমদ শফি চলতি বছরের গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পর হেফাজতের আমিরের পদটি এখন শূন্য রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে হেফাজতের আত্মপ্রকাশ হলেও সংগঠনটি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে ১৩ দফা দাবিতে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে ২০১৪ সালে ৫ মে শাপলা চত্বর অবরোধের মাধ্যমে।

হেফাজতের শুরা কমিটির কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিভয়েসকে জানান, হেফাজতে ইসলামের সামনের কাউন্সিলকে ঘিরে তা বাস্তবায়ন করার জন্য ১৮ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হবে। এটি কাউন্সিল বাস্তবায়ন কমিটি হিসেবে পরিচিতি। এই ১৮ জনই সারাদেশের প্রায় ৩শ আলেমকে নিয়ে হেফাজতের কেন্দ্রীয় শুরা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকেই আমির ও মহাসচিব নির্বাচন করা হবে। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে হেফাজতের সদরদপ্তর হিসেবে পরিচিতি আল জামেয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম (হাটহাজারী বড়) মাদ্রাসায়‌।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী সিভয়েসকে বলেন, ‘হেফাজতের আমির আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর আমিরের পদটি শূণ্য রয়েছে। কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষাও শেষ হয়েছে গত ২৯ সেপ্টেম্বর। এখন খুব দ্রুত হেফাজতের সম্মেলন (কাউন্সিল) আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করা হবে। অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের নতুন আমির ও মহাসচিব নির্বাচনের বিষয়ে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলছে। সম্মেলনে কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতে আমির ও মহাসচিব নির্বাচিত হবেন।’ তবে কারো বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে চাননি তিনি।

হেফাজতের কেন্দ্রেীয় কমিটির সদস্য ও উত্তর জেলা হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদরিস সিভয়েসকে বলেন, ‘দেশ বরণ্য আমেল আল্লামা শফীর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। তারমধ্যে এখন আমিরের পদটি শূন্য রয়েছে। সবাই এখন তাকিয়ে আছে কে হচ্ছেন হেফাজতের নতুন আমির। আমরা চাচ্ছি গ্রহণযোগ্য একজন শীর্ষ আলেমকে হেফাজতের আমির নির্বাচন করতে।’

হেফাজতের মধ্যে বিভক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হেফাজতের মধ্যে কোন বিভক্তি নেই। তবে কিছু সুবিধাবোগী রয়েছে। তাদেরকে চিহিৃত করার চেষ্টা করছি। কাউন্সিলের আগে আমি আমির ও মহাসচিব নিয়ে সরাসরি কথা বলেতে চাইনা।


জানা গেছে, মাওলানা শাহ আহমদ শফি আমৃত্যু পযন্ত একক নেতৃত্বে হেফাজতের সাংগঠনিক কর্মক্রম পরিচালিত করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর হেফাজতের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত দেখা দেয়। এরমধ্যে বিভিন্ন কারণে চরম বিরোধের জের ধরে আল্লামা শফীর পুত্র ও হেফাজতের প্রচার সম্পাদক মাওলানা আনাস মাদানী মাদ্রাসার শুরা কমিটির মাধ্যমে গত ১৭ জুন হাটহাজারী মাদ্রাসার সহযোগী পরিচালকের পদ থেকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে সরিয়ে দেন।

মূলত তখন থেকেই কওমি ও হেফজতের বড় একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এনমকি আল্লামা বাবনুগরীকে হেফজতের মহাসচিব পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা চলছিলো বলে হেফাজত নেতারা তখন জানিয়েছিলেন। এসব ঘটনার পর হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর দুপুর থেকে হঠাৎ মাদ্রাসার ছাত্ররা হাটহাজারী মাদ্রাসা অবরুদ্ধ করে রেখে আনাস বিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে এবং ছাত্ররা ৫ দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন শুরু করে। শুরু হয় আল্লামা শফীর পুত্র, মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষা পরিচালক আনাস মাদানী হঠাও আন্দোলন।

এসবের মধ্যে পরিস্থিতি যখন উৎপ্ত হতে থাকে তখন ওই দিন সন্ধ্যার দিকে দারুল উলমু হাটহাজারীর শুরা কমিটির সদস্যরা তৎক্ষাণিক বৈঠক ডেকে শফী পুত্র আনাস মাদানীকে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করেন। এরপর আন্দোলনকারী ছাত্রদের দাবির মুখে ১৭ সেপ্টেম্বর মাদ্রাসার মহাপরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রায় ৩৫ বছর পযন্ত হাটহাজারী বড় মাদ্রাসার মহাপরিচালকের পদে থাকা আল্লামা শাহ আহমদ শফি। পরের দিন ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

এদিকে হেফাজতের শুরু থেকে আল্লামা শফির সাথে থাকা কওমি অঙ্গনের বড় আলেম ও হেফাজতের দায়িত্বশীল একজন নাম প্রকাশ না করা শর্তে সিভয়েসকে বলেন, ‘আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর পুরো কওমি অঙ্গন শোকাহত হয়েছে। এরমধ্যে এখন আলোচনা চলছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নতুন আমীর কে হবেন। আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যুর পর এখন হাতে গোনা শীর্ষ দু’একজন আলেম রয়েছেন। তাদের মধ্যে থেকে একজনকে হেফাজতের আমির নির্বাচন করতে হবে। হোক সেটা আল্লামা নুর হুসাইন কাসেমী, আল্লামা মহিবুল্লাহ্ বাবুনগরী অথবা আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। দেশের আপামরজনতা ও কওমি অঙ্গনের সবাই তাদেরকে খুব শ্রদ্ধা করেন এবং খুব পছন্দ করেন। আমরা চাই তাদের মধ্যে থেকে যেন হেফাজতের নতুন আমির ও মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়।’

তিনি আলও বলেন, ‘যদি তাদের মধ্যে থেকে আমির ও মহাসচিব নির্বাচন করা হয় তাহলে কওমি অঙ্গন ও হেফাজতের মধ্যে কোন বিরোধ থাকবে না। তাদের বাহিরে যদি তৃতীয় কাউকে এই শীর্ষ পদ গুলোতে বসানো হয়। তাহলে হেফাজতের মধ্যে বিভক্তি বাড়তে থাকবে যা হেফাজতের জন্য অনিশ্চিত সংকেত বলে মনে করি।’

এদিকে বেফাকের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়ার পর হেফাজতের বড় একটি অংশ চাচ্ছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের বর্তমান মহাসচিব, দারুল উলুম হাটহাজারী প্রধান শাইখুল হাদিস ও শিক্ষা পরিচালক হাফেজ আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী কে আমির হিসেবে দেখতে।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন বর্তমানে কওমি অঙ্গনের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ যে কজন আলেম আছেন তাদের মধ্যে বাবুনগরী অন্যতম। তিনি এখন আমির হতে পারেন। আমির চট্টগ্রামের হলেও মহাসচিব হবে ঢাকা কেন্দ্রিক।
হেফাজত নেতারা বলছেন, জুনায়েদ বাবুনগরী হেফাজতের আমির এবং জমিয়তের মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর হেফাজতের সভাপতি আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী কে হেফাজতের মহাসচিব হিসেবে দেখা যেতে পারে বলে অনেকে ধারণা।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 6
    Shares


এই বিভাগের আরো খবর