• বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ০৭:২০ অপরাহ্ন
  • বাংলা বাংলা English English

হেফাজত ইসলামের হাল কে ধরবেন ?

মোঃ সিরাজুল মনির, চট্টগ্রাম
প্রকাশ হয়েছে : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ২:১৩ pm
                             
                                 

প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ সাড়ে ১০ বছরেরও বেশি সময় ‘হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ’ এর সর্বোচ্চ পদ ‘আমীর’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। গতকাল তার মৃত্যুর পর শূন্য হয়েছে পদটি। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে সংগঠনটির হাল কে ধরবেন সেটা নিয়েই চলছে নানা আলোচনা।

শাহ আহমদ শফী ১৯৮৬ সালে আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদরাসা বা হাটহাজারী মাদরাসার ‘মুহতামিম’ (মহাপরিচালক) পদে নিয়োজিত হন। গত ১৭সেপ্টেম্বর এক উদ্ভূত পরিস্থিতির পর মাদরাসার সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী কমিটি ‘মজলিশে শূরা’র বৈঠকে মুহতামিম পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।

মাদরাসা এবং সংগঠন দুটো ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম-কানুনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। হেফাজত ইসলামের কর্মকাণ্ড সাংগঠনিক সভায় এবং মাদরাসার যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ‘শূরা’ কমিটির বৈঠকে গৃহীত হয়। তবে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগই হাটহাজারী মাদরাসার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নানাভাবে সম্পৃক্ত আছেন। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানের কওমী মাদরাসাগুলোর উপরও হাটহাজারী মাদরাসার প্রভাব আছে। কারণ, শাহ আহমদ শফী ছিলেন কওমী মাদরাসা বোর্ড-বেফাক এর সভাপতি। আবার কওমী মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই মূলত হেফাজতে ইসলামের কর্মী ও সমর্থক। ফলে হাটহাজারী মাদরাসা এবং হেফাজত ইসলাম দৃশ্যত আলাদা হলেও দুটোর মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় ঠিকই আছে। তাছাড়া হেফাজতে ইসলামের কেউ কেউ মনে করেন, হাটহাজারী মাদরাসার যিনি মুহতামিম থাকবেন তিনিই সংগঠনের আমীর হবেন। তাই হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক থেকে পদত্যাগের সাথে সাথেই হেফাজতে ইসলামের হাল কে ধরবেন সে প্রশ্নটা সামনে চলে আসে। এখন শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুতে তা আরো জোরালো হয়েছে।

এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক বলেন, হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটি আছে, শূরা আছে তারাই ঠিক করবেন পরবর্তী আমীর কে হবেন। হেফাজত ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো আমীর পরিবর্তন হয়নি। এখন বৈঠক করে ঠিক করা হবে।
মাদরাসার মুহতামিম যিনি হবেন তাকেই সংগঠনের আমীর নির্বাচন করা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাদরাসার যিনি প্রধান হবেন তিনিই হেফাজতে ইসলামের আমীর হবেন এমন কোনো বিধান নেই। সংগঠনের গঠনতন্ত্রেও এমন কিছু উল্লেখ নেই। তবে মাদরাসার মুহতামিম হিসেবেই হুজুরকে আমীর বানানো হয়েছিল।’

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, সংগঠনটির কোন গঠনতন্ত্র নেই। অর্থাৎ কোন পদ্ধতিতে আমীর বাছাই করা হবে তার সাংগঠনিক কোন গাইড লাইন নেই। এক্ষেত্রে হেফাজতের সাংগঠনিক বৈঠকেই আমীর বাছাই করা হবে। বৈঠকে তীব্র মতবিরোধ হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বললেন হেফাজতের এই নেতা। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই সাংগঠনিকভাবে বিভক্ত হেফাজত নেতারা।

হেফাজত ইসলামের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, দেশের শতাধিক কওমী মাদরাসার শিক্ষকদের নিয়ে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে হেফাজতে ইসলাম। শাহ আহমদ শফী এবং ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন চেয়ারম্যান মুফতি ইযহারুল ইসলাম সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে সংগঠনটি প্রথম আলোচনায় আসে একইবছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি নগরের লালদীঘি মাঠে ‘ধর্মহীন শিক্ষানীতি প্রণয়ন, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল’সহ বিভিন্ন দাবিতে সমাবেশের ডাক দিয়ে। ওইদিন সমাবেশে যোগ দিতে আসা নেতাকর্মীদের সাথে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সংঘর্ষ হয় এবং ৪৩ জনকে আটক হয়। পরে হাটহাজারী মাদরাসায় সমঝোতা বৈঠকের পর ধৃতদের ছেড়ে দেয়া হয়।

২০১১ সালের ১ এপ্রিলও নগরীর আন্দরকিল্লা ও হাটহাজারীতে প্রস্তাবিত নারী নীতি ও ফতোয়া রায় ইস্যুতে সমাবেশ করতে গিয়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ায় সংগঠনটির কর্মীরা। ওই বছর সংগঠনটি বিভিন্ন বিষয়ে ১৩ দফা দাবিও উপস্থাপন করে। এরপর ২০১৩ সালের মার্চ মাসে ১৩ দফা দাবি নিয়ে ঢাকায় লং মার্চ করার ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে নগরের ওয়াসা মোড়ে একটানা ৩২ ঘণ্টা অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করে তারা। সর্বশেষ একইবছরের ৫ মে ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচি পালন করতে রাজধানীর শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে পিছু হটে তারা। পরদিন ৬ মে শাহ আহমদ শফীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ায় হাটহাজারীতে সড়ক অবরোধ করে সংগঠনটির কর্মীরা।

জানা গেছে, শাপলা চত্বর ঘটনায় ২০১৩ সালের ৬ মে গ্রেপ্তার হন সংগঠনটির মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী। পরে মুক্তি পেলেও তার সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয় শাহ আহমদ শফীর। সংগঠনটির একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন বাবুনগরী। এরই মধ্যে শাহ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানীর নেতৃত্বে আরেকটি বলয় গড়ে ওঠে। এছাড়া গত বছর দেড়েক ধরে সিনিয়র নায়েবে আমীর মহিবুল্লাহ বাবুগরী, নায়েবে আমীর মুফতি ইজহার এবং দলের দুই যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ ও মাঈনউদ্দিন রুহীর নেতৃত্বেও আলাদা বলয় তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা পৃথক পৃথক বিবৃতিও দিয়েছেন। তবে শাহ আহমদ শফী জীবিত থাকায় দূরত্ব থাকলেও সাংগঠনিক নেতৃত্ব নিয়ে বড় ধরনের কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়াননি বিভক্ত নেতাদের অনুসারিরা। এখন শাহ আহমদ শফীর অনুপস্থিতিতে শীর্ষ নেতাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ বাড়বে নাকি কমবে তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সংগঠনটির ভেতরে-বাইরে। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন করে কে হাল ধরছেন সংগঠনটির, সেটাই দেখার অপেক্ষায় আছেন হেফাজতের কর্মী ও সমর্থকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 14
    Shares


এই বিভাগের আরো খবর